অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য বৈঠক হোক
আতাউস সামাদ
বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের আইনগত ও নৈতিক ভিত্তি খুবই নড়বড়ে হয়ে গেছে। এ দুই দিক থেকেই এমন সব প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যেগুলো বাস্তবিক পক্ষে প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদের কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অস্তিত্ব সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে। গত ১২ মে টেলিভিশন ও রেডিওর মাধ্যমে প্রদত্ত ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, ‘২০০৭-এর ১২ জানুয়ারিতে এক অনিবার্য পরিবর্তনের পটভুমিতে আমরা দায়িত্ব নিয়েছিলাম। আজ প্রায় ১৬ মাসের সংস্কার কার্যক্রমের ভিত্তিতে আমরা কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক উত্তরণের চুড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছি।’ তাঁর ওই ভাষণের ঠিক ৬ মাস পর দেখা যাচ্ছে যে, তাঁর সরকার নিজেই পরিবর্তিত হবার পটভুমিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর তা বহু বিলম্বিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন অদুর-ভবিষ্যতে অনুষ্ঠিত হতে পারে সেই সম্ভাবনার জন্য নয় মোটেও। বরং তা এ কারণে যে, এই সরকারটি সাংবিধানিক বৈধতা হারিয়েছে। আর তা হয়েছে এ সরকার এবং এর হুকুমে প্রতিষ্ঠা করা নির্বাচন কমিশনের কর্মকান্ডের জন্য।
গতকাল দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় সাংবাদিক কাজী হাফিজ রিপোর্ট করেছেন যে, ১১ সদস্যের সরকারের মধ্যে প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ এবং আরো ৬ জন উপদেষ্টা যথা-ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, ড. ইফতেখার আহমদ চৌধুরী, ড. সিএস করিম, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, জনাব আনোয়ারুল ইকবাল এবং বেগম রাশেদা কে চৌধুরী তাদের বর্তমান সরকারি পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। কারণ, আমাদের সংবিধানের ৫৮গ(৭) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হতে হলে সেই ব্যক্তিকে ‘সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইবার যোগ্য’ হতে হবে। এখন নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাব করা এবং এ সরকারের পাস করা গণপ্রতিনিধিত্ব (সংশোধিত) অধ্যাদেশে বলা আছে যে, কোনো সরকারি, সামরিক বা বেসামরিক, চাকরি থেকে অবসর নেবার পর ৩ বছর পার না হলে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচনের যোগ্য হবেন না। ওই আইনে এও বলা আছে যে, কোনো বেসরকারি সংস্হার প্রধান নির্বাহীও চাকরি ছাড়ার পর ৩ বছর পার না হলে সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য যোগ্য হবেন না। উপরোক্ত ৭ জনের মধ্যে ৫ জনের বেলায় প্রথম শর্তটি এবং ২ জনের বেলায় দ্বিতীয় শর্তটি প্রযোজ্য।
নির্বাচন কমিশন যখন এ সংশোধনীগুলো প্রস্তাব করে তখনই প্রশ্ন ছিল যে, এই জাতীয় শর্তগুলো আদৌ গণতান্ত্রিক কিনা। শুরু থেকেই একটা ধোঁয়াটে পরিস্হিতির সুযোগ নিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা অনির্বাচিত একটা সরকারের কাছে গণতান্ত্রিক কাজ অবশ্য আশাও করা যায় না। তার ওপর আইনের মারপ্যাঁচে যাদের বড়জোর ৩ মাস ক্ষমতায় থাকার কথা তারা যখন প্রায় ২ বছর পার করছে তখন তাদের দৃষ্টি বা চিন্তা এবং বিশ্লেষণ শক্তি ঘোলাটে হয়ে যাওয়ার কথা। হয়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। ওপরে যে অধ্যাদেশের কথা উল্লেখ করা আছে, স্বাভাবিক সময়ে সেরকম আইন পাস হতো জাতীয় সংসদে চুলচেরা বিশ্লেষণের পর। প্রায় দু’বছর ধরে আমাদেরকে সেই সুযোগ পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। জাতিকে এভাবে বঞ্চনা করাটাও শুধু সংবিধানের লঙ্ঘন নয়, মারাত্মক ছলনাও বটে। একে জনগণ কী বলবেন, অনৈতিক, নীতিহীনতা নাকি ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতি? এখানে উল্লেখ করা ভালো, সর্বশেষ জাতীয় সংসদের মেয়াদোত্তীর্ণ হবার পর ৯০ দিনের ভেতরে যে আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করেনি নির্বাচন কমিশন, মাননীয় হাইকোর্ট সেই ব্যর্থতাকে সংবিধানের লঙ্ঘন বলে অবিহিত করেছেন।
এই দেরি করার অজুহাত হিসেবে দেখানো হয়েছে একটা নতুন ভোটার তালিকা তৈরি করা, যাতে ভোটারদের ছবিও থাকছে। এ ভোটার লিষ্টকে নির্ভুল বলে দাবি করা হচ্ছে। এটা তৈরি করেছে সেনাবাহিনী শহরে শহরে, গ্রামে গ্রামে মুলত স্কুল শিক্ষকদের সহায়তা নিয়ে। তবে এই নির্ভুল বলে দাবি করা ভোটার লিষ্টটা আসলে কতখানি ভুল ছাড়া তা দেখা যাবে নির্বাচনের সময়। এখানে বলে রাখা দরকার, আমরা যতখানি জানি মুদ্রিত ভোটার লিষ্ট এখনো সব নির্বাচনী এলাকায় পৌঁছেনি। কাজেই এই তালিকা কতটা নির্ভুল তা যাচাই হওয়ার প্রকৃত সুযোগ এখনো আসেনি। আর এ লিষ্টের আগমনের অছিলা করেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে এতদিন পর্যন্ত কেবলই পিছু হটতে হয়েছে। আর আমরা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক শাসন ব্যবস্হার কবলে মৌলিক অধিকারবিহীন হয়ে পড়ে থাকলাম।
এই লেখার শুরুতেই ড. ফখরুদ্দীন আহমদের ভাষণের যে উদ্ধৃতি দিয়েছি তাতে ‘১৬ মাসের সংস্কার’ কার্যক্রম বলে একটি কথা ব্যবহার করা হয়েছে। সংস্কার বলে বর্ণিত সেসব কাজের মধ্যে একটা ছিল ‘সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশন আইন প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী কমিশন প্রতিষ্ঠা করা’-এই কমিশনকে তদন্ত, বিচার এবং জরিমানা করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল। গত ২৫ আগষ্ট বাংলাদেশের ৪ নাগরিক আদিলুর রহমান শুভ্র, ফরিদা আখতার, ডা. দীপুমণি ও নাসির উদ্দিন এলান ওই আইনটিকে অবৈধ ও সংবিধানবহির্ভুত ঘোষণা করার জন্য হাইকোর্টের কাছে আবেদন করেন। গতকাল মাননীয় আদালত ওই আইনটিকে সংবিধানবহির্ভুত বিধায় অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন। আপাতত এটাই হলো এ সরকারের সংস্কারের নামে বেআইনি কাজ করার সর্বশেষ নিদর্শন। তা তো হলো, কিন্তু আমরা ভেবে পাচ্ছি না ওই কমিশন যাদের কাছ থেকে শুদ্ধির নামে টাকা আদায় করেছে সরকার সেই টাকাটা কোন আইনের অধিকার বলে তার তহবিলে রাখবে। আমরা এও ভেবে পাচ্ছি না, যারা দুর্নীতি করেছে বলে ওই জরিমানা দিয়েছিল তারা যদি এখন আমাদের সামনে এসে গলা ফাটিয়ে বলে যে, তারা একদম নির্দোষ এবং সৎ অথবা তাদের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র তখন আমরা তাদের কি উত্তর দেব? তদুপরি দুর্নীতি দমন কমিশন যাদের বিরুদ্ধে মামলা করে বিশেষ আদালতের রায় পেয়েছে এবং আরো যাদের বিরুদ্ধে মামলা করছে (তাদের প্রায় সবাই রাজনীতিবিদ) তারা যদি দাবি করেন যে, তাদের বিরুদ্ধে যেভাবে তদন্ত করা হয়েছে তাতে বৈধ অনুসন্ধানের চেয়ে অবৈধ পিটুনির এবং জরুরি বিধিতে গ্রেফতার হবার ভীতি বেশি কাজ করেছে তখন তাদের কথা অবিশ্বাস করার সম্ভাবনা আর কতটুকুইবা বজায় থাকল ক্ষমতাসীনদের বেপরোয়া কাজকর্মের পর।
এদিকে এ সরকার গত বছর এবং এ বছর জরুরি বিধি প্রয়োগের নামে যেসব তুঘলকি কাজ-কারবার করেছে সেই পথ ধরে নির্বাচনের জন্য দলীয় ভিত্তিতে উন্মুক্ত প্রচারের কাজ শুরু হতে না হতে বন্ধ করে দিয়েছে জরুরি আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করার হুমকি দিয়ে। যার ফলে ঘোষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হবার প্রক্রিয়া মুখ থুবড়ে পড়েছে। আর কথিত সংস্কারের নামে সরকার ও নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী বাছাইয়ের কাজকে ‘তৃণমুল’ পর্যায়ে পাঠানোর বন্দোবস্ত করে কালো টাকা ও পেশিশক্তির বিকেন্দ্রীকরণ করেছে তাও চাক্ষুস করা গেল গত কয়েকদিনে। সাদা চোখে দেখা যাচ্ছে এবং সহজেই অনুভব করা যাচ্ছে, এমন এতসব অপকীর্তির পর এ সরকারের দেশ শাসন করার কোনো অধিকার নেই। আর তার সঙ্গে বলা যায়, বর্তমান নির্বাচন কমিশনের আওতায় সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করার কোনো যুক্তি অবশিষ্ট নেই।
এই পরিস্হিতি থেকে দেশকে মুক্ত করতে প্রয়োজন অবিলম্বে জরুরি অবস্হা প্রত্যাহার করা এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর তথা বড় দু’দলের মধ্যে একটি কর্মসুচি বা কর্মপ্রণালী নিয়ে ঐকমত্য, যেমন তারা করেছিল ১৯৯০ সালে ৩ জোটের ঘোষণা ও সেনাশাসক লে. জেনারেল (অব.) এরশাদের হাত থেকে ক্ষমতা হস্তান্তর ও পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে। এদিক থেকে সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী এবং দু’দলের নেত্রীদ্বয় বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার মধ্যে এ বিষয়ে বৈঠক ও যৌথ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত জরুরি। (সূত্র, আমার দেশ, ১৪/১১/২০০৮)
No comments yet.








